স্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যায়াম

নিয়মিত শরীর চর্চা অনুশীলন বা ব্যায়াম মাংসপেশী এবং দৈহিক গঠনকেই শুধু মজবুত এবং দৃঢ় করে না দেহের প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সক্রিয় রাখে এবং দৈহিক কর্মক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। রোগে প্রতিরোধে, কর্ম চাঞ্চল্যকে টিকিয়ে রেখে দীর্ঘায়ু লাভে সহায়তা দান, উপযুক্ত শরীরচর্চার মাধ্যমেই সম্ভব। আমরা অনেকেই শরীর চর্চার বিষয়ে উদাসীন-কায়িক পরিশ্রমবিমুখ। অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে পড়ি একটু বৃষ্টি বা ঠান্ডায় ভিজলেই সর্দি-কাশিতে ভুগতে থাকি। নাগরিক সভ্যতায় সম্পৃক্ত হয়ে দেহকে নড়াচড়ার সুযোগ না দিয়ে আর ক্রমাগত শর্করা ও চর্বি খাবার (কলেস্টেরলসমৃদ্ধ) মেদ স্ফীতি, ডায়াবেটিস ইত্যাদি মেটাবলিক রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। অথচ একটু সময় করে স্বাস্থ্য চর্চায় মন দিলে উপকারের শেষ নেই।

আমরা যখন শুয়ে থাকি অর্থাৎ বিশ্রাম নেই বিশেষত ঘুমের সময় তখন বিপাক ক্রিয়া কমে যায়, হ্নদপিন্ড ধীরে ধীরে স্পন্দিত হয় (মিনিটে ৬০ বার) শরীরের তাপমাত্রাও যায় কমে (বগলে ৩৬·২ সে-৩৫·৫ সে) (মিনিটে ৭২-৭৫ বার), বিপাক ক্রিয়ারও উন্নতি ঘটে। তাপমাত্রা বেড়ে ৩৭ সে পর্যন্ত পৌঁছায়।

কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম অনুশীলনের সময় শরীরের মধ্যে চমৎকার পরিবর্তন ঘটে। হৃদস্পন্দন যেমন বাড়তে থাকে তেমনি ধমনীর রক্তচাপ এবং বিপাক প্রক্রিয়াও যথেষ্ট বৃদ্ধি পায়। মাংসপেশী এবং রক্তে বিশেষ বিশেষ রাসায়নিক পদার্থের উদ্ভব হয়। শিরা ও ধমনীতে পর্যাপ্ত রক্ত প্রবাহ হয়ে থাকে। হৃৎপিণ্ডও যথারীতি পর্যাপ্ত রক্ত সঞ্চালনে তৎপর হয়ে পড়ে। যেহেতু অক্সিজেন রক্তের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর ব্যায়ামের সময় অধিকতর অক্সিজেন ফুসফুসের মাধ্যমে রক্তে প্রবেশ করে এবং দেহ কোষ ও কলায় প্রবেশ করে ফলে কোষকলাগুলো পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টি উপাদান পেতে পারে এবং অক্সিজেনের সহায়তায় আত্তীকৃত করতে পারে। এভাবেই ব্যায়ামের ফলে রক্ত অক্সিজেনসমৃদ্ধ হয়ে দেহকে অধিকতর পরিপুষ্ট হওয়াকে ত্বরাম্বিত করে। ব্যায়ামের সময় গভীরভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার ফলে দেহের মধ্যচ্ছদা সজোরে নিচের দিকে নামে। (বক্ষ স্থলের বিস্তৃতির ফলে)। এর কারণে লিভার বা যকৃত থেকে রক্ত বের হয়ে রক্ত সঞ্চালনে অংশগ্রহণ করে। যকৃৎ হয় কর্মক্ষম সবল। ব্যায়ামের ফলে মাংসপেশী ছন্দোবদ্ধভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়। ফলে শিরার উপরও পর্যায়ক্রমিক চাপ বাড়ে ও কমে এবং শিরার রক্ত হ্নদপিণ্ডে পরিশুদ্ধির জন্যে যায়।

কায়িক পরিশ্রমে অভ্যস্ত বা ব্যায়ামে দক্ষ ব্যক্তির হ্নদস্পন্দন অপেক্ষাকৃত কম থাকে এবং ধমনী চাপও থাকে নিচু। সঠিক ও নিয়মিত শরীর চর্চার মাধ্যমেই অল্প আয়াসে এবং না হাঁপিয়ে অধিকক্ষণ ব্যায়াম করার দক্ষতা অর্জন করা যায়। অপেক্ষাকৃত ধীর স্পন্দন হৃদপিন্ডকে যেমন বিশ্রাম দেয় ব্যায়াম অনুশীলনকারীকে শ্রমশীল হতেও সুযোগ করে দেয় অনেক। তাই বলে মাত্রাতিরিক্ত শ্রম বা ব্যায়াম কখনো কাম্য নয়।

বুদ্ধিজীবীদের জন্য শারীরিক ব্যায়াম খুবই প্রয়োজন। পাভলভ মন্তব্য করেন, যারা হালকা পেশীগত কাজ করে এবং জীবনের পরীক্ষা ও কঠোর দুঃখ কষ্টে অধিকতর সাড়া দেয় তাদের হ্নদপিণ্ডই বেশি রোগগ্রস্ত হয়। চিকিৎসাসম্মত শরীর চর্চা হৃদরোগেও উপকারী। তবে তা অবশ্যই চিকিৎসকের কঠোর নির্দেশ এবং উপদেশ অনুযায়ী করা দরকার। অনেকেই মনে করেন বেশি বয়সে শরীর চর্চা সম্ভব নয়। ধারণাটা ভুল। ৫০ বছর বয়সের পরও পদযাত্রা, জগিং, হালকা ব্যায়াম, স্কি ও অন্যান্য খেলাধুলা অনুমোদনীয় এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ফলপ্রদ। ব্যায়ামের স্থান হিসাবে খোলামেলা জায়গা বেছে নেয়াই ভালো এবং ব্যায়ামের সময় গভীরভাবে ঠিকমত স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া উচিত। মুখ দিয়ে নয়-নাক দিয়েই শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়া উচিত।

মনে রাখতে হবে শরীর চর্চা ও খেলাধুলা শারীরিক সংগঠন মজবুত করার পাশাপাশি মানসিক গঠনকেও দৃঢ় করে। ব্যায়াম মস্তিষ্কের কর্ম তৎপরতা বাড়ায়। আবেগ ও মননশীলতাকেও সমৃদ্ধ করতে সহায়তা করে। নীরোগ দেহে কর্মতৎপর এবং আনন্দমুখর দীর্ঘ জীবন প্রত্যাশায় শরীরচর্চার বিকল্প নেই।

————————-
দৈনিক ইত্তেফাক, ১০ মে ২০০৮

Article Tags: -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!