ভেজাল ওষুধ থেকে সাবধান

ভেজাল ওষুধ খাওয়া মানে বিষ খাওয়া। বাংলাদেশের ওষুধের বাজারে কী পরিমাণ ভেজাল ওষুধ আছে, এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। ১৯৯৩ সালের গোড়ার দিকে প্যারাসিটামল সিরাপ-ট্র্যাজেডির কথা অনেকেই হয়তো জানেন। সে সময় অসংখ্য শিশু ভেজাল প্যারাসিটামল খেয়ে মারা যায়। আমরা জানি প্যারাসিটামল জ্বর ও ব্যথা নিবারণের সবচেয়ে জনপ্রিয় ওষুধ। ট্যাবলেট আকারে পূর্ণবয়স্ক মানুষ এবং সিরাপ আকারে শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়।

এ ছাড়া ওষুধ কোম্পানিগুলো শিশুদের ব্যবহারের জন্য সাসপেনশন আকারে প্যারাসিটামল তৈরি করে থাকে। প্যারাসিটামল পানিতে দ্রবীভূত হয় না। সিরাপ তৈরি করতে লাগে দ্রাবক। সাধারণত প্রপাইলিন গ্লাইকল (দ্রাবক হিসেবে) দিয়েই প্যারাসিটামল সিরাপ তৈরি করা হয়। ইথাইলিন গ্লাইকল ও ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল হচ্ছে প্রপাইমিল গ্লাইকলের সমগোত্রীয় সর্বনাশা আত্মীয়। প্রপাইলিন গ্লাইকলের দাম বেশি হওয়ায় একশ্রেণীর অসাধু ওষুধনির্মাতা শিশুদের এই ওষুধে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। এবং এর ফলে অসংখ্য শিশু কিডনির তীব্র নিষ্ক্রিয়তায় মৃত্যুবরণ করে।

ভাবতে আশ্চর্য লাগে, যে জিনিস হাইড্রলিক ব্রেকের তরল পদার্থ কিংবা পেইন্ট প্লাস্টিক কারখানায় দ্রাবক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তা নিমিষে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল শিশুদের ওষুধে। যে কারণে কিডনি বা বৃক্কযন্ত্রের নিষ্ত্র্নিয়তায় অনেক শিশুর মৃত্যু হয়। ১৯৮৬ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে ডাই-ইথাইলিন গ্লাইকল মিশ্রিত গ্লিসারিন ব্যবহারের কারণে বিখ্যাত জে জে হাসপাতালে ১৪ জন রোগী মারা যায়। ব্যাপক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ১৯৮৮ সালে ৩০ জানুয়ারিতে প্রতিবেদনটি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে মহারাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেন।

অথচ বাংলাদেশে এতগুলো শিশু মারা যাওয়ার পরও কারও কোনো শাস্তিই হয়নি। এখন অনেক ভেজাল ওষুধ বাংলাদেশে সর্বত্র বিক্রি হচ্ছে। গ্রামগঞ্জের হাটে-বাজারে এখন অনেক ভেজাল ওষুধ হরদম বিক্রি হয়। অধিক মুনাফার জন্য অসাধু ব্যবসায়ীরা এই ওষুধ বাজারজাত করে থাকে।

আর গ্রামাঞ্চলের গরিবমানুষ কম দামের কারণে ভেজাল ওষুধ কিনে থাকে। প্যারাসিটামল-ট্র্যাজেডির সময় যখন বাজারে সঠিক প্যারাসিটামলের দাম ছিল ১২-১৩ টাকা, তখন আক্রান্ত শিশুদের অভিভাবকেরা আট টাকা দিয়ে ওষুধ নামের ওই বিষ কিনেছিলেন। আর এই ভেজাল ধরার কথা ওষুধ প্রশাসন পরিদপ্তরের। তাদের অবস্থা তথৈবচ। সারা দেশে মাত্র ৪৫ জেলা শহরে তাদের অফিস আছে। সারা দেশে মাত্র ৩০ জন ড্রাগ সুপার। ভেজাল ধরবে কীভাবে?

————————
সুভাষ সিংহ রায়
ফার্মাসিস্ট
দৈনিক প্রথম আলো, ০৭ মে ২০০৮

Article Tags: - - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!