ভাতের সহযোগী আলু

ভেতো বাঙালি বলে আমাদেরকে যতই উল্লেখ করা হোক এখানে সেখানে, পৃথিবীর নানা দেশের অসংখ্য লোক কিন্তু ভাত খায়। তবে পরিমাণে কম খায়। আর ভাত এতো ভালো শ্বেতসার আর এতো সহজপাচ্য যে এর জুড়ি মেলা ভার। কিন্তু বিশ্বজুড়ে চালের দাম যে বেড়েই চলেছে এমন অবস্থায় কেবল ভাতের উপর নির্ভর করে বসে থাকা কি ভালো? সবাই এখন বিকল্প শ্বেতসার খুঁজছেন, যোগও করছেন খাবারে। আমাদেরও বসে থাকা কেন?

এদিকে আলুর বদনামও হয়েছে অনেক। দৃষ্টিনন্দন পটেটো স্যালাডকে অনেকে না বলে দিচ্ছেন এই কারণে যে আলু খেলে নাকি শরীরে মেদ হয়। ভাতের বদলে আলু খেতে বললে উষ্মা তো হতেই পারে। তার চেয়ে বরং ভাতের সহযোগী হিসাবে আলু খেতে বলাই ভালো। তাহলে কোন্‌ শ্বেতসার খাব? কথা তো হতেই পারে। নানা বেলার খাবার প্ল্যান করতে গিয়ে তখন গ্লাইসিমিক ইনডেক্সের মত জটিল ব্যাপারও এসে যায়। তবে শরীরে এনার্জির একটি ভালো উৎস ‘আলু’ সম্বন্ধে ভ্রান্ত ধারণাও আছে আমাদের মধ্যে। আলুর যে অনেক গুণ তা এসব ধারণার মধ্যে চাপা পড়ে যায়। আলুর মধ্যে চর্বি আছে অতি সামান্য (একটি মাঝারি আয়তনের আলুর মধ্যে মাত্র ০•১ মিলিগ্রাম)। আর আলুতে মোটেও কোলেস্টেরল নেই। নর্থ ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের হেলথ সায়েন্স ফ্যাকাল্টিতে ট্রান্স ডিসিপ্লিনারি হেলথ বিভাগের আফ্রিকা ইউনিটের পরিচালক অধ্যাপক হেস্টার ভস্টার বলেন, ‘খোসাসহ আলু সিদ্ধ করলে এতে এনার্জি মূল্য কমে এবং স্লিমিং ডায়েট হিসাবে এবং দেহের ওজন কমানোর জন্য খাদ্য হিসাবে আলু আদর্শ’।

আলু খেলে পেট ভরাট লাগে, তিন ঘণ্টা পর্যন্ত পেট ভরাট লাগে, এজন্য ওজন হ্রাসের খাদ্য হিসাবে আলু বেশ ভালো।

যেহেতু আলু কোলেস্টেরলমুক্ত সেজন্য হৃদস্বাস্থ্যকর হিসাবে একে বিবেচনা তো করাই যায়। ইঁদুরের ওপর আলু সমৃদ্ধ খাদ্যের প্রভাব সম্বন্ধে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করেছেন গবেষকরা (ইউরোপিয়ান জার্নাল অব নিউট্রিশন, ভলুম ৪৫, ইস্যু ৫, ২০০৬) এদের বক্তব্য হলোঃ রান্না করা আলু গ্রহণ করলে দেহে এন্টি অক্সিডেন্ট সুরক্ষা বাড়ে, লিপিডের বিপাক উন্নত হয়, হৃদরোগ প্রতিরোধে এসব ফলাফল বিবেচ্য হতে পারে। আমাদের শরীর স্থূল হলে মেদ ঝরাতে বেশ কষ্ট এবং কেন এই কষ্ট এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে অনেক। বিশেষজ্ঞরা ইনসুলিন মানকে আমাদের দেহে চর্বি দহনের ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কিত করতে চাইছেন। আমরা যেসব শ্বেতসার গ্রহণ করি এগুলো দেহে ইনসুলিন মানের উন্নতি নির্ধারণ করেঃ এসব শ্বেতসারের গ্লাইসিমিক ইনডেক্স যত উঁচুতে, ইনসুলিন মানও থাকে তত উঁচুতে। যখন ইনসুলিন মান নিচু থাকে, তখন আমাদের শরীরে প্রধানত চর্বি দহন হয় এবং যখন ইনসুলিন উঁচুতে, তখন শ্বেতসার দহন হয়। অধ্যাপক ভস্টার বলেন, কখনো সখনো আমাদের শরীরকে এমন সব খাবার দিতে হয় যাদের গ্লাইসিমিক ইনডেক্স (জিআই) উঁচুতে-যেমন ধরুন, ক্রীড়াবিদ খুব দৌড়-ঝাপের পর যখন আরোগ্য লাভ করছেন, যকৃতের গ্লাইকোজন সরবরাহ পুনঃভরন হচ্ছে, অথবা এমন কোনো পরিস্থিতি যখন দ্রুত প্রাপ্য গ্লুকোজ দিতে হয় তখন উঁচু জি,আই শ্বেতসার দিতে হয়। সিদ্ধ আলু, গরম গরম আলু ভর্তা, এর রয়েছে উঁচু গ্লাইসিমিক ইনডেক্স, তখনকার জন্য আদর্শ খাদ্য। প্রফেসর ভস্টার অবশ্য এও বললেন, আলুর সব সময় উঁচু জি,আই থাকবে এমনো কথা নয়। ‘যখন সিদ্ধ আলু ঠান্ডা করা হয় এবং ঠান্ডা খাওয়া হয়, শ্বেতসার পিছু হটে এবং জি,আই কমে আসে। এর মানে হল শ্বেতসারের একটি অংশ গ্লুকোজ হিসাবে হজম হয় না বরং বৃহদন্ত্রে ফার্মেন্টেশন হয়ে সর্টচেন মেদ অম্লে পরিণত হয়। অবশ্য এটি অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য বেশ ভালো। আলু স্যালাড হিসাবে ঠান্ডা খাওয়া যায়, এর জি,আই নিচু বা মাঝারি মানে এবং ডায়েবেটিক ডায়েট হিসাবে এটি বেশ ভালো।’ আলুর ডিশে, ম্যায়োনিজ, তেল, ঘি মাখন যোগ করলে জি,আই কমে আসে আরো, ডিশের পুষ্টি উপকরণও পরিবর্তিত হয়। তাই আমাদের খাদ্যে সহযোগী হিসাবে আলু থাকতেই পারে। আলু হলো পুষ্টিসমৃদ্ধ সবজি, সামান্য কিলোজুল এনার্জি পেলেন, অথচ পুষ্টি পেলেন অনেক। এটি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো, নানা ধরনের স্বাদু ও লোভনীয় খাবার তৈরি হতে পারে আলু থেকে, পুষ্টি সফলতাও অনেক। খাবারে বৈচিত্র্য আনা স্বাস্থ্যের জন্য যেমন ভালো তেমন বিকল্প নানা খাবার হলে বিশেষ খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঠেকানো যায়। মনোপলি গড়ে উঠার বিরুদ্ধে এটি একটি হাতিয়ারও বটে।

——————
অধ্যাপক ডাঃ শুভাগত চৌধুরী
পরিচালক, ল্যাবরেটরী সার্ভিসেস, বারডেম, ঢাকা।
দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪ মে ২০০৮

Article Tags: - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!