বাংলাদেশে মরণোত্তর কিডনি দান

বর্তমান বিশ্বে কিডনি রোগের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল বিশ্বে এই হার সবচেয়ে বেশি। ফলে কিডনি অকেজো রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যাচ্ছে। এই বৃদ্ধির হার এতটাই ব্যাপক যে, অদুর ভবিষ্যতে এটা মহামারি আকার ধারণ করতে পারে যদি এর ত্বরিত প্রতিকারের উপায় উদ্ভাবন করা না হয়।

কিডনি অকেজো হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে, নেফ্রাইটিস, ডায়াবেটিস ও উচ্চরক্তচাপ। নেফ্রাইটিসের কারণে আমাদের দেশে শতকরা ৪০ ভাগ, ডায়াবেটিসের কারণে ২৪ ভাগ এবং উচ্চরক্তচাপের কারণে ১৫ ভাগ রোগীর কিডনি অকেজো হচ্ছে।

বর্তমানে কিডনি রোগের সংখ্যা বৃদ্ধির দরুন কিডনি অকেজো রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজন নিয়মিত ডায়ালাইসিস অথবা কিডনি সংযোজনের মতো আধুনিক চিকিৎসা।

আমাদের দেশে বর্তমানে সীমিত পর্যায়ে কিডনি সংযোজন করা হয়ে থাকে। শুধু নিকটাত্মীয়ের দান করা একটি কিডনি, কিডনি অকেজো রোগীর দেহে প্রতিস্হাপন করা হয়। কিডনি দাতার অভাবে অধিকসংখ্যক রোগীর দেহে কিডনি সংযোজন করা সম্ভব হয় না।

উন্নত বিশ্বে ৭০ ভাগ কিডনি সংগ্রহ করা হয় মৃত ব্যক্তির দেহে থেকে এবং সেই সঙ্গে লিভার, হার্ট, ফুসফুস প্যানক্রিয়ায় অকেজো অঙ্গ রোগীর দেহে প্রতিস্হাপন করা হয়। বাংলাদেশে এই প্রথম মৃত ব্যক্তির কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ নিয়ে রোগীর দেহে প্রতিস্হাপন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। মৃত ব্যক্তির কিডনি দানে সামাজিক বা ধর্মীয় দিক থেকেও কোনো বাধা নেই। এ লক্ষ্যে সৌদি আরবসহ অন্য মুসলিম ওলামারা ১৮৭৭ সালে এ মর্মে উপনীত হন যে, মৃত্যুর পর কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ দান করার কোনো বাধা নেই। ফলে প্রায় দুই দশক থেকে সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশে সাফল্যজনকভাবে মৃত ব্যক্তির কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ সংযোজন করা হয়ে থাকে। সাম্প্রতিক বিএসএমএমইউতে এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ১৬ ভাগ আইসিসিইউতে ভর্তি রোগী তাদের মৃত্যুর পর কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ দান করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এতে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশেও রোগীদের সচেতন করা গেলে তার মৃত্যুর পর কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ দান করতে সম্মত হবেন এবং এতে শুধু কিডনি অকেজো রোগীরাই উপকৃত হবে না বরং লিভার, হার্ট, ফুসফুস অকেজো রোগীরাও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখবেন।

বাংলাদেশে শুধু ঢাকাতেই সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রায় ১০টির বেশি আইসিইউতে ১০০টি বেড রয়েছে। এখান থেকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ বহু রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। এসব রোগীকে মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কিডনিসহ অন্যান্য অঙ্গ ৫ থেকে ২০ ঘণ্টা সংরক্ষণ করা গেলে অকেজো অঙ্গের দেহে প্রতিস্হাপন করা সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ব্রেন ডেথ কমিটি গঠন এবং ঢাকার জন্য একটি পুর্ণাঙ্গ অরগান প্রকিউরম্যান কমিটি গঠন করা। এই কমিটির কাজ হবে ব্রেন ডেথ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর নিকটাত্মীয়কে অঙ্গ দানে সম্মত করা এবং রোগীর আত্মীয়-স্বজন রাজি হলে অরগান প্রকিউর করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্হা গ্রহণ করা এবং তা উপযুক্ত হাসপাতালে এই অঙ্গ পৌঁছে দেয়া। এ পদ্ধতি কার্যকর করা গেলে হাজার হাজার কিডনি অকেজো রোগীসহ অন্যান্য রোগী নতুন জীবন ফিরে পাবেন। সম্মেলনে এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং এর সমাধান বের করা সম্ভব হবে। বিশ্ব দ্রুত এগিয়ে চলেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সে সঙ্গে বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের সুস্হ দেহে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। আমরা জাতি হিসেবে পিছিয়ে থাকতে পারি না। সুতরাং আমরা যদি একটু উদ্যোগ নেই, তবে হতভাগ্য হাজার হাজার কিডনি অকেজো রোগীসহ লিভার, হার্ট এবং ফুসফুস অকেজো মৃতপ্রায় রোগীদের জীবন ফিরিয়ে দেয়া সম্ভব হবে।

সূত্রঃ দৈনিক আমারদেশ পত্রিকায় ১৭ নভেম্বর ২০০৭
লেখকঃ অধ্যাপক ডা. হারুন অর রশিদ
পিএইচডি, এফসিপিএস, এফআরসিপি, বিভাগীয় প্রধান, কিডনি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্ট, কিডনি ফাউন্ডেশন

Article Tags: - - -

Related Bangla Health Articles:


১টি মন্তব্য

  1. admin at 3:33 pm on February 3rd, 2008

    test comment


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!