প্রস্টেট গ্রন্থির সমস্যা

প্রস্টেট পুরুষদের ইন্টারনাল অর্গানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এটা না থাকলে মানুষের জীবন শুধু ঝুঁকিপূর্ণ হয় তাই নয়, পুরুষের সুখময় দাম্পত্য জীবনে প্রোষ্টেট-এর রয়েছে এক অনবদ্য ভূমিকা। এই প্রস্টেট- এর নানা সমস্যা, নানা রোগ রয়েছে। বিশেষকরে চল্লিশোর্ধ পুরুষের বছরে অন্ততঃ একবার অন্যান্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি প্রস্টেট-পরীক্ষা করানো উচিত। প্রস্টেট গ্রন্থি বেড়ে গিয়ে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। প্রস্টেটের সমস্যাকে হালকা করে দেখা উচিৎ নয়। প্রস্টেট গ্রন্থির যত্ন নিন, সুস্থ থাকুন। প্রস্টেট নিয়ে আমাদের এই ধারাবাহিক রচনার প্রয়াস। প্রস্টেট গ্রন্থি নিয়ে আপনাদের সমস্যার কথা লিখুন।

প্রস্টেট গ্রন্থি পুরুষের মূত্রথলির সামান্য নীচে অবস্থিত এক টুকরো মাংশপিন্ড যার মধ্যে দিয়ে মূত্র নালী গিয়েছে। এই গ্রন্থিটি বয়স বাড়ার সাথে সাথে বেড়ে যায়। এই বৃদ্ধি কারও কারও ক্ষেত্রে অসুবিধা সৃস্টি করে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা সৃস্টি করে না বা সামান্য অসুবিধা সৃস্টি করে।

প্রস্টেট জনিত সমস্যা গুলোর মধ্যে রয়েছে ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া বিশেষত রাত্রে। চিকন নালীতে প্রস্রাব হওয়া, বেগ পেলে প্রস্রাব ধরে রাখতে কষ্ট হওয়া, প্রস্রাবের শেষে কিছু প্রস্রাব থলিতে রয়ে গেছে মনে হওয়া, প্রস্রাবের শেষে অনেকক্ষণ ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব ঝরতে থাকা এবং এক পর্যায়ে প্রস্রাব আটকে যাওয়।

এই সব উপসর্গ থাকলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগ নিশ্চিত করতে হয়। সাধারণত যে সব পরীক্ষা করা হয় তা হলো প্রস্রাবের রুটিন, মাইক্রোসকপিক ও কালচার সেনটিভিটি পরীক্ষা, আল্ট্রাসোনোগ্রাম, কে, ইউ বি এক্সরে-ইউরোফ্লোমেট্রি, সিরাম পি•এস•এ সিসটোমেট্রাগ্রাম বা ইরোডাইনামিক ষ্ট্যাডি ইত্যাদি।

প্রস্টেটের গ্রন্থির সমস্যার ক্ষেত্রে দুই ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায়। একটি হলো ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে এবং অন্যটি হলো অপারেশন করে। অপারেশন আবার দুই প্রকার একটি প্রস্রাবের রাচ্চা দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে অন্যটি পেট কেটে। কোন রোগী কোন পদ্ধতির জন্য উপযুক্ত তা চিকিৎসক নির্ধারণ করবেন।

প্রস্টেটের ঔষধে চিকিৎসাঃ ক্ষেত্রে বিশেষে প্রস্টেট বৃদ্ধিজনিত উপসর্গসমূহ ঔষধ প্রয়োগের মাধ্যমে উপশম লাভ করা যায়। সাদারণত দুই গ্রম্নপের ঔষধ প্রয়োগ করা যায়। এর এক গ্রম্নপ ঔষধ প্রস্টেটের মাংশপেশীসমূহ শিথিল করে প্রস্রাবের বাধা দূর করে। এদেরকে বলা হয় আলফা বস্নকার। অন্য গ্রম্নপ হল প্রস্টেটের আকার ছোট করে। এই গ্রম্নপটি হরমোন মেনুপুলেশনের মাধ্যমে কাজ করে। এই গ্রম্নপের ঔষধ যদিও নিরাপদ তবুও কিছু ক্ষেত্রে পুরুষত্ব হানী করে। অন্য দিকে আলফা বস্নকারের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে বীর্য পাত পিছনের দিকে মূত্র থলিতে হতে পারে।

শল্য চিকিৎসাঃ আধুনিক পদ্ধতিতে পেট না কেটে প্রস্রাবের রাস্তা দিয়ে যন্ত্রের সাহায্যে অপারেশন করা যায়, একে বলে ঞটজচ। এই পদ্ধতিটি বাংলাদেশের ইউরোলজিস্টরা সফলতার সাথে বিগত কয়েক দশক ধরে প্রয়োগ করে আসছেন। এই পদ্ধতিতে যন্ত্রের সাহায্যে সরাসরি প্রস্টেট এবং ইউরিনারি বস্নাডারের ভিতরের অংশ দেখা যায়। এর পর হাইফ্রিকোয়েন্সি কারেন্টের সাহায্যে প্রস্টেটকে চিপস আকারে কেটে বের কের আনা হয়। দীর্ঘদিন প্রস্টেট রোগে ভূগলে মূত্রথলির ভিতর পরিবর্তন আসে। মূত্র ত্যাগের পর অধিক পরিমাণ প্রস্রাব থলিতে জমা থাকলে মূত্র থলির সংকোচন ক্ষমতা কমে যেতে পারে বা কিডনীর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে এমনকি কিডনী নষ্ট হয়ে যেতে পারে। সুতারাং এ ধরণের অসুখ নিয়ে অবিলম্বে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া প্রয়োজন। সফল অস্ত্রপচারের ১০দিনের মধ্যে রোগী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারে। ২-৬ সপ্তাহ ভারী ওজন তোলা, স্ত্রীর সাথে মেলা মেশা করা এবং ড্রাইভিং থেকে বিরত থাকা প্রয়োজন। সচরাচর যে সকল প্রশ্ন রোগীরা করে থাকেনঃ ১) পঞ্চাশ উর্দ্ধে প্রায় সকল পুরুষের প্রস্টেট বড় হতে থাকে কিন্তু সকলের উপসর্গ দেখা দেয় না কেন?

বয়স বাড়ার সাথে সাথে প্রস্টেট বাড়তে থাকে। এই বৃদ্ধির হার ৫০ বসরের উপরে বেশি তবে কিছুক্ষেত্রে প্রস্টেট না বেড়ে ছোট হয়ে যেয়েও সমস্যা সৃস্টি করে যাকে বলা ফাইব্রাস প্রস্টেট। প্রস্টেট রোগের লক্ষণ নির্ভর করে প্রস্টেট গস্নান্ড মূত্র প্রবাহের উপর কতটুকু বাধা সৃষ্টি করেছে তার উপর বা এটা মূত্রথলির ভিতর কতটুকু বৃদ্ধি পেয়েছে তার উপর। উসর্গগুলো সরাসরি প্রষ্টেট গ্রন্থির আকারেরর উপর নির্ভর করে না। ২) কাদের ক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগ করা এবং কাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করা হয় যে সব পুরুষ মানুষের প্রস্টেট জনিত রয়েছে কিন্তু তা মারাত্মক নয় কিংবা অপারেশন করতে চান না অথবা অপারেশনের জন্য উপযুক্ত নন তাদের ক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগ করা হয় যাদের প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায় বা উপযুক্ত চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগ করেও প্রস্রাব করতে পারছেন না, যাদের প্রস্রাবের থলিতে অধিক পরিমাণ প্রস্রাব মুত্র ত্যাগের পরও থেকে যায় বা প্রস্রাবের ধারা অত্যান্ত কম, যে সব ক্ষেত্রে ঔষধ প্রয়োগে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না, যাদের প্রস্টেটের সাথে অন্য জটিলতা রয়েছে তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করা হয়। (৩) ঞজটচ অপারেশনে কি কি অসুবিধা দিতে পারে-

সফল অপারেশন হলে প্রথম দু’ সপ্তাহ প্রস্রাবে জ্বালা যন্ত্রণা করতে পারে’ বা ফোঁটায় ফোঁটায় প্রস্রাব ঝরতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে প্রথম ২-৩ সপ্তাহ মাঝে মাঝে প্রস্রাবের সাথে দু’এক ফোটা রক্ত ঝরতে পারে। (৪) ঞজটচ অপারেশন কি খুবই বেদনা দায়ক। অপারেশনের পর সাধারণ ব্যাখ্যা অনুভূত হয় না তবে ক্যাথেটার থাকার জন্য অস্বস্থি হতে পারে। ৫) ঞজটচ অপারেশনের ক’দিনের মধ্যে স্বাভাববিক জীবনে ফিরে আসা যায়। ক্যাথেটার খুলে ফেলার পর স্বাভাবিক প্রস্রাব করা যায়। তবে কিছু ক্ষেত্রে সাধারণত বড় প্রস্টেট হলে কয়েক দিন প্রস্রাব ঝরতে পারে যা পরবর্তিতে ঠিক হয়ে যায়।

যদিও বাইরের দিকে কোন কাটা ছোটা হয় না তবুও মনে রাখতে হবে প্রস্রাবের রাচ্চার ভিতর দিয়ে প্রস্টেট কাটা হয় তাই ভিতরটা কিছু দিন কাঁচা থাকে এবং শুকাবার জন্য কয়েক সপ্তাহ প্রয়োজন। এ সময় ভারি জিনিস উঠানো পায়খানায কোথ দেয়া, স্ত্রীর সাথে মেলা মেশা না করা বাঞ্চনীয়।

————————–
ডাঃ মুহাম্মদ হোসেন
সহকারী অধ্যাপক, ইউরোলজিষ্ট
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
চেম্বারঃ ঢাকা রেনাল হাসপাতাল,
৫ গ্রীন কর্ণার, গ্রীন রোড, ঢাকা
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ মার্চ ২০০৮

Article Tags: - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!