নৈরাশ্যজনিত কারণে র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজ

ডেন্টাল ক্যারিজ মানে দাঁতের ক্ষয়রোগ, যার বিকাশ হয় অতি ধীরে ধীরে অবিরাম গতিময় ভঙ্গিতে।

মুখে জমে থাকা খাদ্যদ্রব্য বিশেষ করে কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা জাতীয় খাবার মুখগহ্বরের বিভিন্ন রোগজীবাণুর দ্বারা বিপাকের মাধ্যমে এদের বাইপ্রডাক্ট বা উপজাত হিসেবে নানা ধরনের এসিড বা অ্যাল তৈরি করে। যেমনঃ ল্যাকটিক এসিড, এসিটিক এসিড, পাইরোভিক এসিড ইত্যাদি। ফলে, মুখে এসিডের আক্রমণ ঘটে। এই আক্রমণে দাঁতের গুরুত্বপুর্ণ খনিজসমুহ (যথাঃ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি) প্রথমত দাঁতের উপরিভাগের অংশ এনামেল থেকে বের হয়ে যায়। এই অবস্হাকে বলা হয় ডিমিনারাইলেজেশন অথবা খনিজক্ষরণ। আর এভাবেই ক্ষয়রোগের সুত্রপাত।

কিন্তু, যে কোনো ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করতে আমাদের দেহের প্রতিটি অংশেই সব সময় কোনো না কোনো পাহারাদার কর্মরত থাকে। ডিমিনারাইলেজেশন অথবা খনিজক্ষরণের পর তৎক্ষণাৎ মুখের লালা গ্রন্হি থেকে নিঃসরিত লালা, যা প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফেট বাই কার্বনেট ইত্যাদি খনিজদ্রব্যে পরিপুর্ণ ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁতকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে রক্ষা করে। প্রধানত, লালায় অন্তর্ভুক্ত বাই কার্বনেট ও ফসফেট মুখগহ্বরের এসিড পরিবেশকে নিরপেক্ষ বলয়ে পরিণত করে এবং লালার ফসফেট ও ক্যালসিয়াম, এসিড আক্রমণে ক্ষয়প্রাপ্ত এনামেলকে পুনর্গঠন বা সংশোধন করে। এই পুনর্গঠন পদ্ধতিকে বলে রিমিনারাইলেজেশন বা খনিজ পুনঃস্হাপন।

যে কোনো কারণবশত যদি দাঁতের ক্ষয় ও পুরণ এই দুই পদ্ধতিতে কোনো ছন্দপতন ঘটে তাহলেই দেখা দেয় বিভ্রাট। দাঁতের খনিজ ক্ষরণে আর খনিজ পুনঃস্হাপন সম্ভব হয় না এবং তখনই ক্যারিজ স্পষ্টতর হয়ে প্রকাশ পায়। এ হলো সাধারণ ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগের কথা। ক্যারিজের প্রকারভেদ অনেক, আর এদের মাঝে র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজ হলো সবচেয়ে আক্রমণাত্মক।

এ ধরনের ক্যারিজ হঠাৎ করেই দেখা দেয়, যা অত্যন্ত দ্রুত গতিতে অতি অল্প সময়ে মুখের প্রায় সব দাঁতকে অনেকটা একই সময়ে আক্রমণ করে।
আমাদের মুখগহ্বরে কিছু দাঁত আছে যা সাধারণত ক্যারিজমুক্ত দাঁত বলে বিবেচিত, নার্সিং ক্যারিজের ক্ষেত্রে যা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। আর তা হলো- নিচের পাটির সামনের দাঁতগুলো। জিভের অবস্হানই এদের ক্যারিজ থেকে নিরাপদ রাখার প্রধান কারণ। কিন্তু র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজের বেলায় এসব দাঁতও ক্যারিজের আক্রমণ থেকে রেহাই পায় না।

র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজ যদিও শিশুকাল থেকে শুরু করে বয়স্কদের যে কোনো বয়সেই হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা গেছে, টিনএজাররা বিশেষ করে এ ব্যাপারে বেশি সংবেদনশীল। আরো কিছু পরীক্ষামুলক গবেষণায় দেখা গেছে, র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজের মুল কারণ মানসিক আবেগ-সংক্রান্ত প্রতিবন্ধকতা। যেহেতু টিনেজাররা তুলনামুলকভাবে বেশি আবেগপ্রবণ সম্ভবত তাই র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজে এদেরই বেশি আক্রান্ত হওয়ার ভয়।
উদাহরণস্বরুপ, মানসিক প্রতিবন্ধকতার কারণগুলো নিম্নরুপ হতে পারে-

  1. আবেগ বা ভয় চেপে রাখলে
  2. চাওয়া-পাওয়ার ব্যর্থতা
  3. পারিবারিক বিরোধ
  4. হীনম্মন্যতায় ভোগা
  5. স্কুল বা কলেজের কোনো বেদনাদায়ক বা অপমানজনক অভিজ্ঞতা
  6. কোনো বিষয়ে বিরামহীন উদ্বেগ বা দুশ্চিন্তা।

বিভিন্ন আবেগজনিত প্রতিবন্ধকতা র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজে অবদান রাখার পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে গবেষণা থেকে এও প্রমাণিত যে, আবেগজনিত সমস্যায় জর্জরিত ব্যক্তিদের মিষ্টি খাবারের প্রতি (বিশেষ করে যে কোনো ধরনের মিষ্টি স্ন্যাকস) এক প্রবল আসক্তি জন্মে, ফলে দাঁতে ক্যারিজের প্রকোপ বাড়াতে সহায়তা করে।

এছাড়া মুখের কম লালা নিঃসরণের প্রক্রিয়া ডেন্টাল ক্যারিজ বর্ধনের ক্ষেত্রে লক্ষণীয়ভাবে অবদান রাখে। এটা আশ্চর্যের কিছু নয় যে, মানসিক নৈরাশ্য, বিষণ্নতা, বিফলতা, উত্তেজনা, স্নায়বিক দুর্বলতা স্বাভাবিক লালা নিঃসরণের বিপরীতে কাজ করে। আবার এ ধরনের মানসিক চাপের চিকিৎসায় কিছু কিছু ওষুধ ব্যবহৃত হয় যেমন ট্রাঙ্কুলাইজার বা সেডেটিভ, যা নতুন করে মুখের লালা নিঃসরণ কমিয়ে দেয়।

সুতরাং নানা কারণে লালার স্বল্পতা এর স্বাভাবিক কার্যকলাপে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে রিমিনারাইলেজেশন পদ্ধতি এবং এসিডমুক্ত পরিবেশ আনা বিশেষভাবে বাধাপ্রাপ্ত হয়।

শুধু তাই নয়, মাসিক নৈরাশ্যকবলিত ব্যক্তির স্বাস্হ্য তথা দাঁতের প্রাথমিক পরিচর্যা ও স্বাস্হ্যসম্মত জীবনযাপনের ক্ষেত্রে উদাসীনতা প্রশ্রয় দেয়া কোনোভাবেই ঠিক হবে না।

অতএব, র‌্যাম্পেন্ট ক্যারিজের জন্য মানসিক উদ্বেগ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ কারণ। আর সেজন্য এ ধরনের পরিস্হিতি মোকাবিলায় শুধু দাঁতের ক্যারিজের চিকিৎসায় সীমাবদ্ধ না থেকে দাঁতের প্রাথমিক পরিচর্যার পাশাপাশি রোগীকে নৈরাশ্যজনিত পরিস্হিতি থেকে মুক্তি দেয়ার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নেয়াটাও জরুরি।

দৈনিক আমারদেশ, ২৪ ডিসেম্বর ২০০৭
লেখকঃ ডা. জেবুন নেছা
সহযোগী অধ্যাপক, প্রিভেনটিভ এন্ড চিলড্রেন ডেন্টিষ্ট্রি
বিএসএমএমইউ, শাহবাগ, ঢাকা

Article Tags: - - - - - - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!