দাঁতের ইনফেকশন থেকে হার্ট অ্যাটাক

দাঁতের ইনফেকশন থেকে হার্ট অ্যাটাকের কথা শুনে হয়তো অনেকেই অবাক হতে পারেন। কারণ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ দাঁতের রোগের বিষয় ওয়াকিবহাল নয়; তারা দাঁতের রোগের নানা প্রতিক্রিয়া সম্বন্ধেও সচেতন নয়। অথচ উন্নত বিশ্বে দাঁতের রোগের নানা ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও যথেষ্ট উৎকণ্ঠা এবং সচেতনতা লক্ষ্য করা যায়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা রিপোর্টে যার বহু প্রমাণ রয়েছে। সাম্প্রতিককালে দাঁতের রোগ থেকে করোনারি হার্ট ডিজিজ, মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্রাকশন, বিভিন্ন রক্তনালীর রোগ, মস্তিষ্কের প্রদাহ, কিডনি সমস্যা, মহিলাদের গর্ভকালীন সময়ে অকাল গর্ভপাত, অকাল শিশু ভুমিষ্ঠ হওয়া, অপুষ্টি শিশুর জন্মলাভ ইত্যাদি নানা সমস্যা বিশ্বব্যাপী লক্ষ্য করা যায়।

প্রতিরোধমুলক ব্যবস্হা গ্রহণ ছাড়া দাঁতের চিকিৎসা করা হলে বিরুপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে। যেমন দাঁত তোলা, স্কেলিং করা, দাঁতের মাঢ়ির শৈল্য চিকিৎসা করা ইত্যাদি থেকে হৃদযন্ত্রের প্রদাহজনিত রোগ সৃষ্টি হতে পারে। দাঁতের পরিচর্যা তথা দাঁত ব্রাশ বা খিলাল করার সময় দাঁতের গোড়া কিংবা মাঢ়ি থেকে রক্তক্ষরণ হলে তা থেকেও হৃদযন্ত্রের নানা রোগ দেখা দিতে পারে।

দাঁতের মাঢ়ি থেকে রক্তক্ষরণ হলে ধরে নিতে হবে যে, অবশ্যই এর পেছনে কোনো কারণ রয়েছে। হতে পারে দাঁতের গোড়ায় ইনফেকশন কিংবা প্রদাহজনিত কারণ, রক্তের ক্যাসারসহ নানা প্রকার রক্তরোগ, হেমোকিলিয়া। কিংবা ডেঙ্গুজ্বর। তবে সাধারণত দাঁতের মাঢ়ি থেকে রক্তক্ষরণ হলে তা প্রদাহজনিত কারণেই বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী দাঁতের এ প্রদাহজনিত রোগটির হার খুবই বেশি। সাম্প্রতিককালে দাঁতের এ ধরনের ইনফেকশনজনিত রোগের সঙ্গে করোনারি হৃদরোগ এবং হার্ট অ্যাটাকের সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। অবশ্য কতিপয় কারণ এর সঙ্গে সংযুক্ত, যেমন-

  1. উচ্চরক্তচাপ
  2. রক্তের মাত্রাধিক কলোষ্টেরল
  3. ডায়বেটিস
  4. অতিরিক্ত পরিশ্রম
  5. দুশ্চিন্তাগ্রস্ত জীবন
  6. মেদবহুল শরীর
  7. ধুমপান
  8. মদ্যপান ইত্যাদি।

এছাড়া বংশানুক্রমিকভাবে কারো যদি হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাকের ইতিহাস থাকে তাহলে কারো কারোর জন্য মুখ ও দাঁতের ইনফেকশন থেকে হৃদরোগ কিংবা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি থাকে বলে গবেষণা রিপোর্টে দেখা যায়।

নিয়মিত মুখ-দাঁতের পরিচর্যা না করার ফলে দাঁতের গোড়ায় জমে থাকা খাদ্যকণা পচে তার সঙ্গে মুখের লালা ও ব্যাকটেরিয়া (জীবাণু) মিশ্রিত হয়ে যে ব্ল্যাক তৈরি হয় মুলত তা থেকেই যত সমস্যার সৃষ্টি।

নিয়মিত মুখ ও দাঁতের স্বাস্হ্য পরিচর্যা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ এবং প্রতিরোধমুলক ব্যবস্হা গ্রহণের মাধ্যমেই হার্ট অ্যাটাকের মতো মৃত্যু ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তাই নিয়মিত দাঁতের পরিচর্চা করতে হবে। যেমনঃ

  1. প্রতিদিন সকালে নাস্তার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে সঠিক নিয়মে দাঁত ব্রাশ করা।
  2. প্রধান খাবারের মধ্যবর্তী সময়ে মিষ্টি জাতীয় খাদ্য পরিহার করা।
  3. অধিক চর্বিযুক্ত খাদ্য পরিহার করা
  4. ধুমপান, মদ্যপান, সাদাপাতা বা জর্দা দিয়ে পান খাওয়া বন্ধ করা।
  5. দাঁতের গোড়ায় প্ল্যাক, পাথর জমে থাকলে তা দ্রুত স্কেলিং করে পরিষ্কার করা।
  6. ব্রাশ করে দাঁত পরিষ্কার না হলে প্লসিং, ইন্টার ডেন্টাল ব্রাশিং এবং প্ল্যাক প্রতিরোধকারী মাউথ ওয়াশ ব্যবহার করা।
  7. মুখ ও দাঁতে কোনো রোগ থাকলে তা দ্রুত চিকিৎসা করা।
  8. উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা রক্তনালীর কোনো সমস্যা থাকলে তার চিকিৎসার পাশাপাশি ডেন্টাল সার্জনের পরামর্শ গ্রহণ করা খুবই জরুরি।
  9. প্রতি ছয় মাস অন্তর মুখ ও দাঁত পরীক্ষা করানো ইত্যাদি।

উৎসঃ দৈনিক আমারদেশ, ১০ ডিসেম্বর ২০০৭
লেখকঃ ডা. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান হাওলাদার
সহযোগী অধ্যাপক, ডেন্টাল ফ্যাকাল্টি
বিএসএম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Article Tags: -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!