চাই থ্যালাসেমিয়ামুক্ত সুস্থ জীবন

প্রতিবছর ৮ মে খুব প্রচার-প্রপাগান্ডার মধ্য দিয়ে শেষ হয় বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস। বড় বড় পোস্টার শোভা পায় দেয়ালে দেয়ালে। যার মধ্যে লেখা থাকে-বাংলাদেশে এক কোটিরও বেশি থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক আছে। শোভাযাত্রা হয় সুন্দর সুন্দর টুপি আর গেঞ্জি পরে। কিছু অঙ্গীকার করা হয় এই রোগ প্রতিকারের। ফিবছর আবার ঘুরে আসে ৮ মে আরও কিছু থ্যালাসেমিয়ার নতুন বাহক নিয়ে। এভাবেই চলছে থ্যালাসেমিয়া রোগ প্রতিরোধ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন।

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। যারা এই রোগের বাহক, তাদের খুব একটা সমস্যা হয় না স্বাভাবিক জীবন যাপনে। সমস্যা হচ্ছে যখন দুজন বাহক বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সন্তান জ্ন্ম দেয় তখন। তাদের চারটা সন্তান হলে দুজন হবে থ্যালাসেমিয়ার রোগী এবং একজন রোগের বাহক। এ রোগটি উত্তরাধিকারসূত্রে মা-বাবা উপহার দিচ্ছে তার সন্তানের প্রাণ সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই। মা-বাবার অজান্তেই এই রক্তচোষা রোগটি সন্তানের শরীরে প্রবেশ করছে-যেখানে প্রতিটি মা শিশুর কপালে খারাপ নজর লাগার ভয়ে কালো টিপ পরিয়ে দেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ৩.৬ মিলিয়ন হচ্ছে বিটা থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক এবং ৪.৮ মিলিয়ন হচ্ছে অন্যান্য অসুস্থ রক্তকণিকা রোগের বাহক। থ্যালাসেমিয়া রোগটি নিয়ে এখন প্রচারের শেষ নেই। আমার মতে, কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এ রোগটি প্রতিহত করার জন্য দরকার শুধুই ইচ্ছা। এই ইচ্ছাটা হতে হবে ব্যক্তিপর্যায়ে, তারপর সরকারি পর্যায়ে।

থ্যালাসেমিয়ার রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে দিনের পর দিন রক্ত দিয়ে যেতে হয়। একসমুদ্র রক্ত দিলেও যেন এই রোগীর তৃষ্ণা মেটে না। উপরন্তু পানিবাহিত রোগের মতো নানা রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়; যেমন-জন্ডিস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত রোগ। এ ছাড়া প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে জমা হচ্ছে ২০০ মিলিগ্রাম করে আয়রন। প্রতি ব্যাগ রক্তের সঙ্গে ২০০ মিলিগ্রাম আয়রন জমা হলে ৫০ ব্যাগ রক্তের সঙ্গে ১০ গ্রাম আয়রন শরীরে জমা হচ্ছে। এই আয়রন আস্তে আস্তে লিভার প্যানক্রিয়াসের প্রতিটি কোষ ধ্বংস করে দেয়। ফলে ডায়াবেটিস, সিরোসিস রোগের উৎপত্তি হয়। থ্যালাসেমিয়ার রোগীর জীবনকাল ২০-৩০ বছর পর্যন্ত। এই স্বল্পকালীন জীবনে রোগীর নিজের ও পরিবারের যে মানসিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বীকৃত মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য বা চিকিৎসা হচ্ছে অন্যতম। কোটি কোটি টাকা সাহায্য বা ঋণ হিসেবে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে ব্যয় হয়। কতটুকু উন্নয়ন হয়েছে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা খাতে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কিছুদিন আগেও সাইপ্রাসে ৭২ শতাংশ শিশু জ্নাত থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে। আজ সেই দেশটিতে এ রোগ নির্মূল সম্ভব হয়েছে শুধু সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও সরকারি আইন প্রণয়ন এবং তার যথাযথ প্রয়োগে।

সরকারের কাছে অনুরোধ
-প্রতিটি বিয়ে নিবন্ধন করতে অবশ্যই রক্তের এইচআইভি, এইচবিএসএজি এবং এইচবি ইলেকট্রোফোরেসিসের রিপোর্ট পাত্র ও পাত্রী উভয়কেই চিকিৎসকের পরামর্শসহ জমা দিতে হবে।
-দুই থ্যালাসেমিয়ার বিয়ে নিষিদ্ধ করতে হবে।
-ভ্রূণ অবস্থায় এ রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রতিটি মেডিকেল কলেজে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
-বিয়ের আগে ও পরে এ ধরনের রোগীদের জন্য জেনেটিক কাউন্সিলের ব্যবস্থা করতে হবে। থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে হলে দুই বাহকের বিয়েকে অবশ্যই ‘না’ বলতে হবে। যদি তাদের মধ্যে কঠিন প্রেম থাকে তবু শরৎচন্দ্রের ভাষায়, ‘বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না দূরেও ঠেলে।’
বৃহত্তর প্রয়োজনে ক্ষুদ্রতর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিতেই হয়।

————————-
ডা. মাসুদা বেগম
সহযোগীঅধ্যাপক, হেমাটোলজি বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখমুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
প্রথম আলো, ২১ মে ২০০৮

Article Tags: - - - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!