গ্যাষ্ট্রিক ক্যান্সার-র‌্যাডিকেল সার্জারি

বিশ্বে পাকস্হলীর ক্যান্সারে মৃত্যুর হার অধিক। সৌভাগ্যের বিষয় হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গ্যাষ্ট্রিক ক্যান্সারে মৃত্যুর হার কমতে শুরু করেছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি বছর ৬ লাখ ২৮ হাজার লোক গ্যাষ্ট্রিক ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে।

বিশ্বে গ্যাষ্ট্রিক ক্যান্সারের হার জাপানিদের ক্ষেত্রে অনেক বেশি। কোরিয়া, রাশিয়া, উত্তর আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় এই রোগ দেখা যায়। তবে এটি এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি যা বিশ্বের সব মানুষের মাঝে দেখা যায়। কোনো কোনো জাতির মধ্যে এই রোগ অধিক, কোনো কোনো জাতির মধ্যে এই রোগের হার খুবই কম।

রোগের কারণঃ
(১) ধুমপানঃ ধুমপায়ীদের মাঝে এই রোগ দেখা যায়; (২) লবণঃ খাদ্যে যারা প্রচুর লবণ গ্রহণ করে তারাও এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে; (৩) ফলমুল ও সবজিঃ যারা ফলমুল ও সবজি কম গ্রহণ করে থাকে তাদের এই রোগ বেশি হয়; (৪) যারা প্রচুর মদ পান করে; (৫) যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে; (৬) যাদের পাকস্হলীতে একবার অপারেশন করা হয়েছে; (৭) পাকস্হলীতে পলিপ থাকলে; (৮) পাকস্হলীতে ঘা থাকলে; (৯) প্রথম ডিগ্রি আত্মীয়-স্বজন যাদের ক্যান্সার হয়েছে। যেমন বাবা-মা; (১০) হেলিকো ব্যাকটোর পাইলোরি দিয়ে ইনফেকশন হলে।

রোগের লক্ষণঃ
 এই রোগ দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রাথমিক ক্যান্সার ও এডভানস ক্যান্সার। প্রাথমিক ক্যান্সারে শতকরা ৮০ ভাগ লোকের কোনো লক্ষণ থাকে না। এই অবস্হায় চিকিৎসার সফলতা অনেক বেশি। এডভানস হলে নানা ধরনের রোগের লক্ষণ নিয়ে আবির্ভাব হয়। যথা-পেটে ব্যথা, খাওয়ায় অরুচি, বমি বমি ভাব ও বমি হওয়া, অল্প আহারে মনে হবে পেট ভরে গেছে, রক্ত পায়খানা, রক্ত বমি, খাবার গিলতে কষ্ট হয়, শরীরের শক্তি কমতে থাকে, পায়ে পানি আসে, শরীর শুকাতে থাকে, লিভার, ফুসফুস, হাড়, মগজ, কিডনি, চর্ম, হার্ট, থাইরয়েড, পেরিটানিয়াম আক্রান্ত হয়ে যায়। পায়ের শিরা আক্রান্ত হয়ে যায়।

পরীক্ষাঃ
নানাবিধ পরীক্ষা দ্বারা এই রোগ নির্ণয় করা যায়। এন্ডোসকপি, বায়োপসি, সিটিস্ক্যান, বেরিয়াম মিল এক্সরে, লিভার, এনজাইম। উদ্দেশ্য হলো শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা ও চিকিৎসা দেয়া। যদি শুরুতেই রোগ নির্ণয় করা যায় তবে রোগীর আয়ু দীর্ঘায়িত হবে। এন্ডোসকপি বায়োপসি এখন প্রায়ই মেডিকেল কলেজগুলোতে চালু হয়েছে যা রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক। গ্যাষ্ট্রিক মনে করে দীর্ঘদিন ওষুধ খাচ্ছেন। নিজ ইচ্ছায় ওষুধের দোকানে গিয়ে ওমেপ্রাজন খাচ্ছেন আর তা কিছুটা হলেও উপশম করছে। এতে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ আলসার বা এসিটিটি থেকে ক্যান্সারে রুপ নিচ্ছে। তাই সন্দেহ হওয়া মাত্রই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন। চিকিৎসক প্রয়োজনবোধে আপনার এন্ডোসকপি করাবেন এবং দুশ্চিন্তা মুক্ত করাবেন।

চিকিৎসাঃ
নানা সফল চিকিৎসা শুরু হয়েছে। তবে সার্জারি একমাত্র চিকিৎসা। এছাড়া রয়েছে রেডিওথেরাপি ও কেমোথেরাপি। সার্জারির সাহায্যে পাকস্হলীর আংশিক বা পুর্ণ অংশ কেটে ফেলা হয়। যার নাম র‌্যাডিকেল গ্যাষ্ট্রেকটমি। এর সঙ্গে পাকস্হলীর পাশের অংশ যথা লিমফ গ্রন্হি, পেরিটোনিয়াম কেটে ফেলা হয়। এর দ্বারা র‌্যাডিকেল সার্জারি সম্ভব। এরপর কেমোথেরাপি দিলে শরীরের যদি কোথাও ক্যান্সার কোষ থাকে তা নষ্ট হয়ে যায়। ফলে ক্যান্সারের বিস্তৃতি নির্মুল হয়ে যায়, মানুষের আয়ু বাড়ে।

আজ একটি কেস নিয়ে আলোচনা করব। নাম সৈয়দ আশরাফ। বয়স ৬৮ বছর। বাসা ঢাকার কলাবাগানে। দেখলে মনে হবে বয়সকালে সুস্বাস্হ্যের অধিকারী ছিলেন। মাত্র ৬ মাসের ব্যবধানে যথেষ্ট স্বাস্হ্যহানি ঘটেছে।

পেটে ব্যথা ও খাওয়ার প্রতি অরুচি দিয়েই অসুখের যাত্রা শুরু। প্রথম প্রথম ভেবেছিলেন এ আর এমন কী! সামান্যতেই ভালো হয়ে যাবে। নিজে ওষুধের দোকানে গিয়ে গ্যাষ্ট্রিকের বড়ি খাওয়া শুরু করলেন। ওষুধ সেবনের পর প্রথম দিকে ৭-৮ দিন ভালো থাকতেন। এভাবে প্রায় তিন মাস চলল। গ্যাষ্ট্রিকের বড়ি খেলে এখন আর ধরে না। মনে বেশ ভয় পেয়ে গেলেন। মাঝে মাঝে বমি হওয়া শুরু হয়েছে। পেটের ব্যথাও বেশ বেড়েছে। একবার খেলে সারাদিন খেতে আর মন চায় না। সারাদিন পেট ভরা ভরা থাকে। শরীরের ওজন কমতে শুরু করেছে। পায়খানা কষা। কখনো কখনো ২-৩ দিন পর পর পায়খানা হয়।

এই উপসর্গগুলো নিয়ে ভারতে চলে গেলেন। নামকরা হাসপাতাল এ্যাপোলো। তারা সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু করলেন। এন্ডোসকপি করালেন। এন্ডোসকপি করে দেখলেন পাকস্হলীতে বিরাট আলসার, খাবারের প্রবেশ পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বায়োপসি নিলেন দেখলেন ক্যান্সার।

এরপর সেখানে আর কোনো চিকিৎসা করালেন না। ফিরে এলেন দেশে, আমার চেম্বারে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম দ্রুত সার্জারি করতে হবে। পাকস্হলীর দুই-তৃতীয়াংশ বাদ দিতে হবে। সঙ্গে লিমফ অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ফেলতে হবে। ৪-৫ ঘণ্টার সার্জারি। খুবই ঝুঁকিপুর্ণ অপারেশন। তবে সঠিকভাবে করতে পারলে রোগী রোগমুক্ত হবে। আমরা সফল সার্জারি করলাম। আট দিনের মাথায় রোগী সুস্হ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। ক্রমান্বয়ে স্বাস্হ্যের উন্নতি হচ্ছে। এক সাইকেল কেমোথেরাপি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। জাপানে পাকস্হলীতে ক্যান্সারের হার খুবই বেশি। সেখানে তারা উন্নত পদ্ধতিতে সার্জারি করে। র‌্যাডিকেল সার্জারিই এদের মুল লক্ষ্য। এতে রোগী অনেকদিন বেঁচে থাকে। জাপানে প্রশিক্ষণ গ্রহণকালে তাদের আধুনিক পদ্ধতি রপ্ত করেছি, যা বিশ্বের সেরা পদ্ধতি হিসেবে খ্যাত।

——————————————
প্রফেসর ডা. মোঃ সহিদুর রহমান
লেখকঃ এমবিবিএস, এফসিসিএস, এফআইসি, এসএস (ইউএসএ); হেপাটোবিলিয়ারি, প্যানক্রিয়েটিক ও লিভার ট্রাসপ্লান্ট সার্জারি বিভাগ।
অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, বিএসএমএমইউ; লিভার, গ্যাষ্ট্রিক, জেনারেল হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনষ্টিটিউট।
বাড়ি নং-১০০/১, রোড নং-১১/এ, ধানমন্ডি আ/এ, সাত মসজিদ রোড (ষ্টার কাবাবের বিপরীতে), ঢাকা-১২০৯
আমার দেশ, ২৭ মে ২০০৮

Article Tags: - - - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!