ক্যান্সারঃ পুরুষের যা জানা দরকার

বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সম্পর্কে জানা থাকলে এবং কি করলে তা প্রতিরোধ করা বা প্রাথমিকভাবে সনাক্ত করা যায় তার উপায় জানা থাকলে, আপনি আপনার জীবন বাঁচাতে পারেন। ক্যান্সার শরীরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই যদি সনাক্ত করা যায়, তাহলে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে অল্প বিস্তর কিছু করার সুযোগ পাওয়া যায়।

১। ফুসফুসের ক্যান্সারঃ

কাদের হওয়ার সম্ভাবনা বেশী?

ধূমপায়ী পুরুষরা ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তাঁদের তামাক সংশিস্নষ্ট অন্যান্য রোগ যেমন- হ্নদরোগ, স্ট্রোক এবং শ্বাসকষ্ট ইত্যাদিতে আক্রান্ত হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে। ফুসফুসের ক্যান্সারের শতকরা ৮০ ভাগেরই কারণ ধূমপান। ‘এসবেটস’ নিয়ে যারা কাজ করেন তাদের ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বিদ্যমান।

সুরক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাঃ প্রতিরোধ

যদি ধূমপায়ী হন তাহলে চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করে দ্রুত ধূমপান ত্যাগ করুন। যদি অধূমপায়ী হন তাহলে কখনো ধূমপান শুরু করবেন না।

২। মুখের ক্যান্সারঃ

কাদের হবার সম্ভাবনা বেশী?

যারা বিড়ি, সিগারেট, হুক্কা অথবা খৈনি খান; পানের সাথে জর্দা, দোক্তা বা তামাক পাতা অথবা ফিমাম খান বা গুল ব্যবহার করেন, তাঁদের মুখের ক্যান্সার হবার সম্ভাবনা খুব বেশী। অপরদিকে যাদের দাঁতের গড়ন ত্রুটিযুক্ত অথবা দাঁত কোনো কারণে ভেঙ্গে যায় কিন্তু ভাঙ্গা অংশ ভালোভাবে মসৃন করা হয় না তাদেরও মুখের ক্যান্সার হতে পারে।

সুরক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা

ধূমপানসহ তামাক ও তামাকজাত দ্রব্যাদির সব ধরনের ব্যবহার বর্জন করলে মুখের ক্যান্সার থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। প্রতিদিনই নিয়ম করে আয়না দেখে নিজেই নিজের মুখ পরীক্ষা করা দরকার। যদি মুখের মধ্যে কোনো জায়গায় লাল অথবা সাদা ছোপ ছোপ দেখা যায় তবে যত শীঘ্র সম্ভব ডাক্তার দেখাতে হবে। দাঁত ত্রুটিপূর্ণ হলে অথবা ভেঙ্গে গেলে তা মুখের ভেতরে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে এর যথাবিহীত চিকিৎসা নিতে হবে।

৩। স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারঃ

স্বরযন্ত্রের অধিকাংশ ক্যান্সারই কারসিনোমা, অন্য জাতের (সারকোমা) ক্যান্সার স্বরযন্ত্রকে আক্রমণ প্রায় করে না বললেই চলে। স্বরযন্ত্রের মধ্যস্থিত ভোকাল কর্ডে ক্যান্সার ধরা পড়ে যায় সবচেয়ে তাড়াতাড়ি। এমন রোগে প্রথমেই গলার স্বর পরিবর্তন হয়ে যায়, যাকে আমরা অনেক সময় বলি গলা ভেঙ্গে যাওয়া। যা কোনো ওষুধেই সারে না। তাই কারও স্বরভঙ্গা তিন সপ্তাহেও না সারলে তাঁর উচিত কোনও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে যোগাযোগ করা। এই ক্যান্সার সময়ে ধরা পড়লে সেরে উঠার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল। কারণ ভোকাল কর্ডের ক্যান্সার স্বরযন্ত্র থেকে অন্যত্র ছড়িয়ে পড়তে অনেক সময় নেয়। স্বরযন্ত্রের অন্যত্র কোথাও ক্যান্সার হলে তা সাধারণত ধরা পড়ে অনেক দেরীতে, কারণ তাতে না থাকে যন্ত্রণা; গলা ধরা, কাশি বা অন্য কোনও লক্ষণ। স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের কারণে গলার আশেপাশের গ্রন্থি ফুলতে পারে অথবা কানে ব্যথাও হতে পারে। বয়স্কদের তাই গলায় কাঁটা ফোটার মতো অনুভূতি, একনাগাড়ে গলা খুসখুস করা কাশি, গিলতে কষ্ট, গলায় বা কানে ব্যথা এবং সর্বোপরি স্বরভঙ্গ হলেই উচিত প্রথমেই কোনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা।

৪। খাদ্যনালীর ক্যান্সারঃ

পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সার বেশী দেখা যায়। সাধারণত যাদের বয়স ৬০-এর কোঠায় তাঁদের মধ্যেই ত্রম্নটি দেখা যায়। কেন হয়?? বেশী মদ্যপান, ধূমপান, নিয়মিত বেশী ঝাল মসলা বা বেশী গরম খাদ্য ভক্ষণ, দীর্ঘকাল এ্যাসিডিটিতে ভোগা ইত্যাদি কারণে। স্বরযন্ত্রের মতো খাদ্য নালীতে কারসিনোমা বেশী হয়।

প্রধান লক্ষণ খাদ্য গ্রহণে কষ্ট, প্রথম প্রথম সেই কষ্ট সীমিত থাকে কেবল শক্ত খাবার-দাবার গ্রহণের, পরে রোগী যে কোন তরল খাদ্য গ্রহণেও অসমর্থ হয়ে পড়ে। এন্ডোস্কোপী (Endoscopy) করে এই রোগ ধরা যায় খুব সহজেই। রোগ নির্ণয় সহজ হলেও খাদ্য নালীর ক্যান্সারের চিকিৎসা বেশ জটিল, সার্জারী (সম্ভাব্যক্ষেত্রে), কেমোথেরাপী ও রেডিওথেরাপীর মাধ্যমে চিকিৎসা করা যায়।

৫। প্রস্টেট ক্যান্সারঃ

কাদের হবার সম্ভাবনা বেশী?

৫০ বা তার বেশী বয়সী সকল পুরুষই প্রস্টেট ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। অবশ্য শতকরা ৭০ ভাগ ক্ষেত্রে এ রোগ ৬৫ বছরের বেশী বয়সীদের মধ্যেই দেখা যায়। কোনো পুরুষের নিকট আত্মীয়ের মধ্যে এক বা একাধিক ব্যক্তির প্রস্টেট ক্যান্সার হবার ইতিহাস থাকলে তার এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে। আবার যাঁরা বেশী পরিমাণে প্রাণীজ চর্বি খান তাদেরও প্রস্টেট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।

সুরক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাঃ সূচনায় সনাক্তকরণ

রক্তে “প্রস্টেট স্পেসিফিক এন্টিজেন”- এর মাত্রা (PSA) পরীক্ষা এবং আঙ্গুল দিয়ে মলাশয় পরীক্ষা (DRE)-এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়েই প্রস্টেট ক্যান্সার সনাক্ত করা যায়। এ ব্যাপারে আপনাকে কি করতে হবে সে বিষয়ে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করুন।

৬। বৃহদন্ত্রের ক্যান্সারঃ

কাদের হবার সম্ভাবনা বেশী?

বৃহদন্ত্রের ক্যান্সার সাধারণত ৫০ বছরের বেশী বয়সীদের মাঝেই দেখা যায়। যাদের এই রোগের ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে ইতিহাস আছে এবং মলাশয় বা মলদ্বারে ‘পলিপ’ আছে অন্যদের তুলনায় তাদের এই রোগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা বেশী। যাঁরা বেশী পরিমাণে চর্বিযুক্ত খাবার খান, যাঁদের দেহের ওজন বেশী, যারা ধূমপান করেন এবং যারা শরীরিক পরিশ্রম করেন না বা সচরাচর নিষ্ত্র্নিয় থাকেন তাঁদের ক্ষেত্রে বৃহদন্ত্রের ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা সমধিক।

সুরক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট পন্থাঃ প্রতিরোধ এবং সূচনায় রোগ নির্ণয়

বৃহদন্ত্রের ক্যান্সার প্রায় সব ক্ষেত্রেই “পলিপ” বা ‘গেজ’-এর মাধ্যমে শুরু হয়। ক্যান্সার হওয়ার পূর্বেই পরীক্ষার মাধ্যমে ‘পলিপ’ সনাক্ত করা গেলে এ রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যদি ক্যান্সারে পরিণত হওয়ার পূর্বেই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে ‘পলিপ’ অপসারণ করা যায় তাহলে এই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা সম্ভব। অল্প চর্বিযুক্ত খাবার এবং বেশী ফল ও শাক-সবজি গ্রহণ এই ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা কমায়। ৫০ বছর বয়সের শুরু থেকে সবার জন্য নিচের পরীক্ষাগুলো করতে হবেঃ

০ প্রতিবছর ‘মলে রক্তের উপস্থিতি পরীক্ষা’ (FOBT)

০ প্রতি পাঁচ বছর অন্তর “সিগমোইডোস্কোপের সাহায্যে বৃহদন্ত্র পরীক্ষা”

০ প্রতি পাঁচবছর অন্তর “ডবল কনট্রাষ্ট বেরিয়াম এনিমা”

০ প্রতি দশ বছর অন্তর “বৃহদন্ত্রের পরীক্ষা” (Colohoscopy)

লেখকঃ ডা· মেহবুব আহসান রনি
উৎসঃ দৈনিক নয়াদিগন্ত, ০২ ডিসেম্বর ২০০৭

Article Tags: - - - - - - - - - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!