কানে পানি ঢুকলে কি কান পাকে?

কানপাকা রোগ নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার পর রোগের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কারণ হিসেবে অতীতে কোনো একসময়ে কানে পানি যাওয়াকে দায়ী বলে মনে করেন রোগীরা। অনেক রোগীই মনে করেন, কানে পানি গেলে কান পাকে। তাদের ধারণা, কোনো একসময়ে গোসল করতে গিয়ে ঢুকে যাওয়া পানিই কানপাকার পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। কোনো কোনো সময় রোগীরা সাম্প্রতিককালে কানে পানি ঢোকার ইতিহাস না বলে পাঁচ-সাত বছর আগের ঘটনাও বলে থাকেন।

কানপাকা সম্পর্কে সাধারণের এই ধারণা একেবারেই ঠিক নয়। আসল কথা হচ্ছে, কানের পর্দায় যদি কোনো ধরনের ফুটো না থাকে তখন বহিঃকর্ণের পথে পানি ঢুকলেও তা পর্দা ফুটো করে মধ্যকর্ণে ঢুকতে পারে না এবং কানপাকা রোগ সৃষ্টিতে কোনো ভূমিকা রাখতে পারে না। সাধারণের কাছে কানপাকা বলে পরিচিত রোগটিকে চিকিৎসা বিজ্ঞানে বলা হয়, ক্রনিক সাপোরেটিভ ওটাইটিস মিডিয়া বা সিএসওএম। কানপাকা রোগের পেছনে দায়ী বিষয়গুলো হচ্ছে­ ঘন ঘন মধ্যকর্ণে ইনফেকশন, শৈশবে হাম, ইনফ্লুয়েঞ্জা, ডিপথেরিয়ার মতো সংক্রামক রোগ হওয়া, কানের পর্দার পেছন দিকে উপরের অংশে, মধ্যকর্ণের ভেন্টিলেসন বা বায়ু চলনে সৃষ্ট সমস্যার জন্য সংহরণ পকেট তৈরি হওয়া (সংহরণ পকেট হচ্ছে কানে পর্দার কোনো অংশে ভেতরের দিকে ঢুকে গিয়ে গর্তের মতো হয়ে যাওয়া) এবং কোলেস্টিয়েটমা নামক ধ্বংসাত্মক পদার্থ সৃষ্টির প্রক্রিয়া চালু থাকা; নির্দিষ্ট কিছু সমস্যার জন্য মধ্যকর্ণে বারবার পানি জমে যাওয়া; মধ্যকর্ণের সাথে নাস-গলবিল বা ন্যাসোফ্যারিংসের যোগাযোগ রক্ষাকারী ইউস্ট্যাশিয়ান টিউব সঠিকভাবে কাজ করতে না পারা ইত্যাদি। এসব কারণ ছাড়াও আরো অনেক কারণ রয়েছে কানপাকার। তবে উল্লিখিত কারণগুলো থেকে কানপাকা রোগ সৃষ্টির পেছনে ঊর্ধ্বশ্বাসনালীর ইনফেকশন, টনসিলাইটিস ও এডিনয়েড বেড়ে যাওয়া (নাকের পেছন দিক বরাবর নাস-গলবিল অঞ্চলে এডিনয়েড নামক লসিকাগ্রন্থির বৃদ্ধি) বিশেষ ভূমিকা রেখে থাকে। প্রকৃতভাবে এসব সমস্যা থেকেই প্রকারান্তরে মধ্যকর্ণে তীব্র সংক্রমণ দেখা দেয়, যা পরে স্থায়ী রূপ নেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সংক্রমণের মূল অনুঘটক হচ্ছে ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাস। কানপাকা রোগ সৃষ্টির পেছনে কোনোভাবেই কানে পানি ঢোকা দায়ী নয়। বরং কানপাকা রোগ থাকলে কোনোক্রমেই যাতে কানে পানি ঢুকতে না পারে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ কানপাকা রোগ থাকা অবস্থায় কানে পানি ঢুকলেই কানপাকা রোগ আরো খারাপ হওয়ার সমূহ আশঙ্কা দেখা দেয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কানপাকা রোগ সেরে যাওয়ার পরও কানের পর্দা ছিদ্র থাকা রয়েই যায় কিংবা কারো কারো ক্ষেত্রে একেবারেই পর্দা থাকে না। উভয় ক্ষেত্রেই কানে যাতে পানি না ঢোকে সে ব্যবস্থা নিয়মিতভাবে মেনে চলতে হয়। সেই সাথে যাতে ঘন ঘন সর্দিকাশি না হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে হয়। কাজেই যাদের কানপাকা রোগ রয়েছে তাদের কানে পানি ঢুকলে সেই কানে বারবার কানপাকা রোগ দেখা দেবে।

তবে যাদের কান ভালো রয়েছে অর্থাৎ যাদের কানের পর্দা ছিদ্র নয় কিংবা যাদের কানের পর্দা অক্ষত আছে তাদের বহিঃকর্ণে পানি ঢুকলে কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কখনো কখনো বহিঃকর্ণে পানি ঢুকে আটকে গেলে তা সাময়িক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করলেও শরীরের তাপেই সেই সামান্য পরিমাণ পানি অল্প সময়ের মধ্যেই বাষ্পীভূত হতে বাধ্য। কিন্তু কোনো কারণে কানে নোংরা ময়লা পানি ঢুকলে বহিঃকর্ণে ইনফেকশন হতে পারে। তাই সুস্থ কানে বহিঃকর্ণ অংশে পানি ঢোকা সমস্যা নয়, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা না করলেও চলবে।

————————
ডা. সজল আশফাক
নাক কান ও গলা রোগ বিশেষজ্ঞ, চেম্বারঃ ইনসাফ ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, ১২৯ নিউ ইস্কাটন, ঢাকা।
দৈনিক নয়া দিগন্ত, ৩০ মার্চ ২০০৮

Article Tags: - - -

Related Bangla Health Articles:


মন্তব্য করুন

All comments are subject to editorial review and decision.

Free Membership. Join Now!